| Your Ads Here 100x100 |
|---|
আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক এই সংস্থা। প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পূর্ণ করে এবার ৮২তম বছরে পদার্পণ করছে জাতিসংঘ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের যুদ্ধ ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত হয়। এর আগে আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসা ও শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গঠিত লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতা করা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা। বর্তমানে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট, মহামারি ও মানবিক বিপর্যয়ের মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে জাতিসংঘের সদর দপ্তর অবস্থিত। সংস্থাটির নামকরণ করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এই সংস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এবং যৌথভাবে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেন।
জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব। সংস্থাটির বর্তমান মহাসচিব পর্তুগালের নাগরিক আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
জাতিসংঘের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো নিরাপত্তা পরিষদ। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই পরিষদে মোট ১৫টি সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। বাকি ১০টি দেশ দুই বছরের মেয়াদে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। স্থায়ী পাঁচ সদস্যের প্রত্যেকের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষা হলো ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। এসব ভাষায় সংস্থাটির সভা, নথিপত্র ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে জাতিসংঘ সচিবালয়ের কার্যকরী ভাষা ইংরেজি ও ফরাসি।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকা
স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় দেশটি। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সদস্যপদ লাভের পর থেকে বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, অভিবাসন, শরণার্থী সংকট ও টেকসই উন্নয়নের মতো বিভিন্ন বিষয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে কর্মকর্তা পাঠানোর মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশি সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন, মানবিক সহায়তা দেওয়া এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাঁরা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় অবদান রেখে চলেছেন। ২০২৬ সালেও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সদস্য পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও দীর্ঘদিনের। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের নেতৃত্ব
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে এক বছরের জন্য এ দায়িত্ব পালন করছেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে অধিবেশন পরিচালনা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা এগিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সদস্যদেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সাধারণ পরিষদে বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। তাই এই পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব দেশের কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে জাতিসংঘ দিবস
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক আয়োজন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, কার্যক্রম এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সংস্থাটির ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
দিবসটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; বরং বিশ্ববাসীর জন্য শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব স্মরণ করার উপলক্ষ। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং সবার জন্য উন্নয়নের সুযোগ তৈরিতে দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা প্রয়োজন, তা-ও এই দিনে নতুন করে সামনে আসে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে চলমান সংঘাত, রাজনৈতিক বিরোধ, মানবিক সংকট ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে জাতিসংঘের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য, নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তারপরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা, সমঝোতা ও যৌথ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে জাতিসংঘের গুরুত্ব রয়েছে।
জাতিসংঘ দিবসে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার নতুন করে স্মরণ করা হয়। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, বৈষম্য কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

