একসময় তিনি ছিলেন ‘আয়নাবাজির নাবিলা’। এরপর দীর্ঘ বিরতি। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো আর বড় পর্দায় দেখা যাবে না তাঁকে। কিন্তু প্রত্যাবর্তনটা হয়েছিল এমন এক সিনেমার মাধ্যমে, যা দেশের অন্যতম আলোচিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে পরিণত হয়—তুফান। আর সর্বশেষ বনলতা সেন-এ একেবারে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে আবারও আলোচনায় এসেছেন মাসুমা রহমান নাবিলা।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে নাবিলার বিশ্বাস, সংখ্যার চেয়ে কাজের মানই একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় গড়ে দেয়।
সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় নাবিলা বলেন, ফিরে তাকালে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়। কারণ তাঁর অভিনীত তিনটি চলচ্চিত্র—আয়নাবাজি, ‘তুফান’ ও ‘বনলতা সেন’—প্রতিটিই দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, বাংলা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকা তৈরি হলে এই তিনটি ছবির নামও থাকবে। একজন অভিনেত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।
তবে পথচলাটা সবসময় সহজ ছিল না। অনেক ছবিতে কাজ করার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। অন্যদের অভিনীত কিছু সিনেমা দেখে তাঁরও মনে হয়েছে, সেই গল্পের অংশ হতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেছেন, একজন শিল্পীর জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাজই যেন অপেক্ষা করে থাকে। ভাগ্যে যা লেখা থাকে, শেষ পর্যন্ত সেটাই নিজের হয়ে আসে।
দীর্ঘ বিরতির সময় তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো দর্শক তাঁকে ভুলে যাচ্ছেন। শোবিজের বহুল প্রচলিত ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’ ধারণা তাঁকেও ভাবিয়েছে। তবে ‘তুফান’ এবং ‘বনলতা সেন’-এর সাফল্য সেই আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করেছে। তাই এখন তিনি অতিরিক্ত প্রত্যাশা করেন না। তাঁর মতে, প্রত্যাশা যত বেশি, হতাশার সম্ভাবনাও তত বেশি।
‘বনলতা সেন’ তাঁর জন্য ছিল বিশেষ চ্যালেঞ্জের একটি কাজ। ছবিটিতে একাধিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পুরো দল দীর্ঘ সময় ধরে মহড়া দিয়েছে। কস্টিউম, প্রপস এবং প্রতিটি দৃশ্যের প্রস্তুতি এতটাই নিখুঁত ছিল যে শুটিংয়ে প্রায় কোনো এনজি শটের প্রয়োজন হয়নি।
নাবিলা জানান, চলচ্চিত্রটির পরিচালক উজ্জ্বল অত্যন্ত পারফেকশনিস্ট। শুটিংয়ের আগে প্রতিটি দৃশ্যের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্যামেরার সামনে যেতে চাইতেন না। এই প্রক্রিয়াই অভিনয়কে আরও স্বাভাবিক ও নিখুঁত করে তুলেছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি উপস্থাপনাও নাবিলার শক্তিশালী পরিচয়। প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করলেও এখানেও তিনি সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এমন অনুষ্ঠানই করা উচিত, যা দর্শকের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেয়।
বর্তমান কনটেন্ট সংস্কৃতি নিয়েও সরব এই অভিনেত্রী। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এখন ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক অনুষ্ঠান মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলছে। একই শিল্পীকে ঘিরে বারবার একই প্রশ্ন করা হয়, ফলে সাক্ষাৎকারগুলো একঘেয়ে হয়ে ওঠে।
নাবিলার মতে, একজন দক্ষ উপস্থাপকের কাজ শুধু প্রশ্ন করা নয়; বরং অতিথির এমন দিকগুলো তুলে ধরা, যা দর্শক আগে জানতেন না। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণাভিত্তিক আলোচনার বদলে বিতর্ক তৈরির উদ্দেশ্যে বিব্রতকর প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিজের ক্যারিয়ারের দিকে তাকিয়ে নাবিলা মনে করেন, তিনি কখনোই কাজের সংখ্যার প্রতিযোগিতায় নামেননি। বরং অপেক্ষা করেছেন এমন চরিত্রের জন্য, যা তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবে। আর সেই কারণেই ‘আয়নাবাজি’র হৃদি, ‘তুফান’ কিংবা ‘বনলতা সেন’—প্রতিটি কাজই তাঁর অভিনয়জীবনে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর সাফল্য মাপা হয় না তিনি কতটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, তা দিয়ে; বরং মাপা হয় কতটি চরিত্র দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে, সেই হিসাবেই।