| Your Ads Here 100x100 |
|---|
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে আবারও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওমানের উপকূলের কাছে ‘রিটি’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজে হামলার পর সেটিতে আগুন ধরে যায়। পরে ওমানের নৌবাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে জাহাজটির ২৫ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করেছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে ওমানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ওমান মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টারের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পানামার পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজটি হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়। হামলার পরপরই জাহাজটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ওমানের নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং জাহাজে থাকা ২৫ জন ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার করে।
তবে জাহাজটিতে কী ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি ড্রোন, নাকি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল, সে বিষয়ে ওমানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা কোনো তথ্য জানায়নি।
সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া নাবিকদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের শারীরিক অবস্থা কিংবা জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ‘রিটি’ একটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার। জাহাজটি পানামার পতাকায় চলাচল করত।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক জাহাজে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে তেহরান। ইরানের দাবি, তাদের নির্ধারিত নিয়ম ও অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।
ইরানের এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব হামলার সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর গত কয়েক মাসে হরমুজ প্রণালিতে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে নিজেদের সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রধান নৌপথগুলোতে ইরানের পুঁতে রাখা সামুদ্রিক মাইন সফলভাবে অপসারণ করেছে মার্কিন বাহিনী।
তিনি বলেন, প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো যেন সব সময় উন্মুক্ত ও নিরাপদ থাকে, তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সেনারা সেখানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার আরও জানান, ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তাঁর দাবি, গ্রীষ্মকাল থেকে এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে দেড় বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানিতে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করেছে ইরান। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে ইরানের নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রার আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ওমানের উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত প্রণালির দক্ষিণ দিকের নৌপথটি ইরানের অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তেহরান ওই পথকে অননুমোদিত ঘোষণা করেছে।
‘রিটি’ ট্যাংকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আইআরজিসি বলেছে, জাহাজটি তার সব ধরনের দিকনির্দেশনা ও অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ইরানের অনুমোদনহীন একটি পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল।
তবে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ওমান ও ইরানের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। একদিকে ওমান উদ্ধার অভিযানের তথ্য জানিয়েছে, অন্যদিকে আইআরজিসি জাহাজটির বিরুদ্ধে নির্ধারিত নৌপথ অমান্য করার অভিযোগ তুলেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা, জাহাজে হামলা এবং নৌপথ নিয়ন্ত্রণের বিরোধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

