| Your Ads Here 100x100 |
|---|
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট, গভর্নর পদ এবং অঙ্গরাজ্য আইনসভাগুলোতে শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
নির্বাচনে হারের কারণ নিয়ে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। ভ্যান্স দলের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়নে ঘাটতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেও নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় ভ্যান্স মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধের মতো বিষয়গুলো ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ট্রাম্প যেখানে কয়েক মাস ধরে ইরান যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন, সেখানে ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে প্রেসিডেন্টের নীতি থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, ভ্যান্সের মন্তব্যে সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে রাজি নন ট্রাম্প। তিনি স্বীকার করেছেন, যুদ্ধ নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই জানিয়ে বলেছেন, সুযোগ পেলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
ভ্যান্সের বিশ্লেষণ সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি, সে কীভাবে বিষয়টি দেখে। আমার মনে হয়, এটি ঠিকই ছিল।’ তাঁর দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়েছে এবং দেশটি ভবিষ্যতেও আর তা অর্জন করতে পারবে না।
এরপর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ভ্যান্সের সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো সে লড়বে না। আমি জানি না, কে লড়বে।’ তবে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি বলতে পারি, যুদ্ধের বিষয়ে আমি আলাদা কিছু করতাম না।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ভ্যান্সকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনে দলের পরাজয় এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই নেতার ভিন্ন অবস্থান সেই সম্ভাবনাকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
ভ্যান্সের বক্তব্যে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা থাকলেও তিনি প্রশাসনের অংশ হিসেবে পুরোপুরি সেই নীতির বাইরে যেতে পারছেন না। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এখন বেশ জটিল। একদিকে দলের পরাজয়ের কারণ তুলে ধরে ভোটারদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা—দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।
এদিকে রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ বিরোধ শুধু ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচনে বড় ধাক্কার পর দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের মতামত তুলে ধরছেন।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডেসান্টিস সতর্ক করে বলেছেন, রিপাবলিকান পার্টি যদি নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্মূল্যায়ন না করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় নির্বাচনি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তাঁর বক্তব্যে দলের বর্তমান কৌশল নিয়ে অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজও দলের নেতাদের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একটি পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের শুনতে হবে এবং সাড়া দিতে হবে। টেক্সাস এখন নীল হয়ে যাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ‘নীল’ বলতে সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনকে বোঝানো হয়। ক্রুজের এই মন্তব্যের মাধ্যমে টেক্সাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
শুল্কনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো হিসেবে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনার মধ্যেও ক্রুজের বক্তব্যে সুর মিলেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দলের ভেতরে ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।
সাবেক রিপাবলিকান সিনেটর মিট রমনি আরও কঠোর ভাষায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি ট্রাম্পের শুল্কনীতি, ‘আবেগপ্রবণ’ যুদ্ধ এবং দৃশ্যমান দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
রমনি লিখেছেন, ‘বাজে নীতি এবং বাজে চরিত্র কখনো ভালো রাজনীতি তৈরি করে না।’ যুক্তরাষ্ট্র এবং নিজের দলকে সঠিক পথে ফিরে আসতে দেখার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের এই পরাজয় দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর রিপাবলিকানদের সামনে এখন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করেই দল সামনে এগোবে, নাকি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে—এ নিয়ে রিপাবলিকান শিবিরে বিতর্ক বাড়ছে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকান পার্টি এখন এক কঠিন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দলের পরাজয়ের দায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট এবং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যাঁকে ঘিরে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য নেতৃত্বের লড়াই এখনই শুরু হয়ে গেছে।

