34.6 C
Dhaka
সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক, চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার

জনপ্রিয়
- Advertisement -
Your Ads Here
100x100

ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও জোরালো করার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। শনিবার দেশজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভের পর আগামী শনিবার আবারও রাজপথে নামার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন করে চাপে পড়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি নিয়ে অসন্তোষ এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।

 

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিনের কর্মসূচিতে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোতায়েন করা হয় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য।

 

বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের কারণে বিক্ষোভের সময় বড় ধরনের লুটপাট ও ভাঙচুর অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এর আগে ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেদিন দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

 

তবে শনিবারের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও আন্দোলন থেমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করছেন। তাঁদের দাবি, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকট দূর করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

 

শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, শুরুতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা অসন্তোষ এখন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মজুরি নিয়ে অসন্তোষ এবং সরকারি সেবার বিভিন্ন সমস্যা মানুষকে রাজপথে নামতে উৎসাহিত করছে।

 

বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সলিডেয়ার্সের সহ-নেতা মুরিয়েল গিলবার ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএম টিভিকে বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ক্ষোভ এখন এক জায়গায় মিলিত হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও দমকলকর্মীসহ নানা গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি আগামী শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

 

শিক্ষকদের সংগঠন এসইউডি এডুকেশনও আগামী ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি জানিয়েছে, তারা চলতি সপ্তাহের মধ্যে পরবর্তী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

 

এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে ২০১৮ সালে জ্বালানির ওপর কর আরোপের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্টস’ আন্দোলনের কর্মীরাও। সংগঠনটি আগামী শনিবার দেশজুড়ে গণসমাবেশের ডাক দিয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন শহরের টাউন হল ও জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

 

ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের কর্মী আজেলমা সিগো সাংবাদিকদের বলেন, ফ্রান্সের মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ জমে আছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক এলাকা, খামার ও কর্মক্ষেত্র—সব জায়গাতেই এই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্য, মানুষের এই ক্ষোভকে উপেক্ষা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।

 

২০১৮ সালে জ্বালানির ওপর কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরে তা দেশটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়। ওই আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সরকারকে জ্বালানির দামসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ছাড় দেওয়াসহ কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল।

 

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেওয়া সহজ নয়। দেশটির সরকারি কোষাগারে চাপ থাকায় নতুন ব্যয় বহন এবং বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারেনি। ফলে বড় ধরনের আইন পাস করা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করাও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

এদিকে ম্যাক্রোঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে বর্তমান মেয়াদ আগামী এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন করে বিক্ষোভের মুখে পড়ায় তাঁর সরকারের রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে। জনঅসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সরকারের ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

 

সংকট মোকাবিলায় সরকার শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তবে আন্দোলনকারীদের নেতারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, তা তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

 

সলিডেয়ার্সের সহ-নেতা মুরিয়েল গিলবার অভিযোগ করে বলেন, সরকারের কাছ থেকে তাঁরা কার্যকর কোনো সাড়া পাননি। তাঁর মতে, শুধু আলোচনা শুরু করলেই হবে না, মানুষের জীবনযাত্রার সংকট কমাতে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

এদিকে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের পুলিশ ইউনিয়নগুলো রবিবার জানিয়েছে, শনিবারের মতো বড় আকারে নিরাপত্তা অভিযান দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল তাদের নেই।

 

শনিবার প্যারিস ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হলেও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।

 

এ ছাড়া শনিবারের ঘটনায় প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগের সপ্তাহে আহত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। ফলে হতাহতের সংখ্যা ও গ্রেপ্তারের পরিমাণ কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই।

 

ফ্রান্সের এই বিক্ষোভের প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পড়ছে। শনিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে।

 

আলবেনিয়াতেও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস অস্থিরতায় রূপ নেয়। অন্যদিকে ইতালির কয়েকটি শহরে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

 

সব মিলিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফ্রান্সে আগামী শনিবারের বিক্ষোভ এবং ৫ নভেম্বরের দেশব্যাপী ধর্মঘট কতটা বড় আকার ধারণ করে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে ম্যাক্রোঁ সরকার এই সংকট কতটা সামাল দিতে পারবে।

- Advertisement -spot_img
সর্বশেষ

ট্রাম্পের অনুমতির অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি

ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অভিযানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক সেনা মোতায়েন রাখা হয়েছে। এখন...