33.3 C
Dhaka
সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা মানুষ, ‘আমাদের নীরব কান্না দেখার কেউ নেই’

জনপ্রিয়
- Advertisement -
Your Ads Here
100x100

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চাল, ডাল, আটা, ময়দা থেকে শুরু করে মাছ, মাংস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। কোনো কোনো সবজির দাম কিছুটা কমলেও মাছ ও অন্যান্য পণ্যের উচ্চমূল্য স্বস্তি দিচ্ছে না ক্রেতাদের। সীমিত আয়ের সঙ্গে বাড়তি খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় খাবার কেনার ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সন্তানদের পছন্দের খাবার কিনে দেওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটু ভালো খাওয়ার ইচ্ছাও পূরণ হচ্ছে না অনেকের।

 

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর একটি বাজারে গিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা যায়। সন্তানকে স্কুলে দিয়ে বাজার করতে এসেছেন নাজিয়া রহমান। মাছের বাজারে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে মাছের দাম দেখছিলেন তিনি। ছোট মাছ কেনার ইচ্ছা থাকলেও দাম শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না।

 

নাজিয়া রহমান বলেন, ‘ছোট মাছ কেনার চেষ্টা করছি। কিন্তু দামের সঙ্গে মিলছে না। টেংরা মাছের কেজি ৭৫০ টাকা চাইছে। ৭২০ টাকা হলে দেবে বলছে। মলা মাছের দাম প্রায় ৫০০ টাকা কেজি। ছোট পুঁটি মাছের দামও ৩০০ টাকার বেশি। এখন কোন মাছ কিনব, সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।’

 

তিনি বলেন, ‘যেভাবে দাম বাড়ছে, তাতে বাজারে এসে আগে চিন্তা করতে হয় কী মাছ কিনব, পরিবারের সদস্যদের কী খাওয়াব। ছেলেমেয়েরা রুই, পাঙাশ কিংবা তেলাপিয়া মাছ আর কত খাবে? একটু ভালো কিছু খাওয়াতে চাইলেও অনেক হিসাব করতে হয়। একদিন ছেলেমেয়েকে পোলাও-রোস্ট খাওয়ালে পরের এক মাস আর সেই খাবারের কথা চিন্তা করতে পারি না।’

 

নিজের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে নাজিয়া বলেন, তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়েসহ চার সদস্যের পরিবার। তাঁর স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্বামীর আয়ে বাড়িভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা, খাবার ও চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিয়মিত হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতে থাকা স্বজনদেরও খোঁজখবর রাখতে হয়।

 

নাজিয়া বলেন, ‘স্বামীর আয়ে সংসারের সব খরচ ঠিকমতো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া দিতে হয়, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ আছে, খাবার কিনতে হয়, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতে হয়। আবার গ্রামের বাড়ির স্বজনদেরও দেখতে হয়। সব মিলিয়ে আমাদের মতো পরিবারগুলো খুব কষ্টে আছে। আমাদের এই নীরব কান্না দেখার মতো কেউ নেই। বাজারে নিত্যপণ্যের যে দাম, তাতে আর পেরে উঠছি না। ছেলেমেয়েদের যখন কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে পারি না, তখন নীরবে কান্না করা ছাড়া আর কী করার আছে?’

 

বাজার করতে আসা আরেক ক্রেতা আয়েশা বেগমও সংসারের খরচ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। তাঁর মতে, সীমিত আয়ের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি, তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

আয়েশা বেগম বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টে আছে আমাদের মতো পরিবারগুলো। যাদের মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার মতো, তারা উভয় সংকটে আছে। তারা না পারে ভালো পরিবেশে থাকতে, না পারে স্বাভাবিকভাবে চলতে। ঢাকা শহরে এমন অনেক পরিবার আছে, যারা বুকের ভেতর কষ্ট চেপে রেখে সংসার চালাচ্ছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘যারা দরিদ্র, তারাও যে ভালো আছে, এমন নয়। তাদেরও প্রতিদিনের খাবার ও পোশাকের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু তারাও দুবেলা ভালো খাবার খেতে পারে না, ভালো পোশাক কিনতে পারে না। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ যে ভালো আছে, তা বলা যাবে না।’

 

নাজিয়া কিংবা আয়েশা বেগম একা নন। বাজারে আসা অনেক ক্রেতার কথায় উঠে এসেছে একই ধরনের হতাশা। প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে দাম শুনে পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, পছন্দের খাবারের বদলে কম দামের পণ্য বেছে নেওয়া কিংবা কিছু পণ্য না কিনেই বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো ঘটনা এখন অনেক পরিবারের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।

 

ক্রেতাদের ভাষ্য, সংসারের আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিনের খরচ বেড়েই চলেছে। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর পর খাবারের জন্য খুব বেশি টাকা হাতে থাকে না। ফলে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকে প্রতিটি কেনাকাটার আগে একাধিকবার হিসাব করতে হচ্ছে।

 

তবে বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে মাছ বিক্রেতাদেরও রয়েছে ভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা। তাঁদের দাবি, মাছের দাম বেশি হওয়ার পেছনে মাছ কেনার খরচের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বড় ভূমিকা রাখছে।

 

বাজারের মাছ বিক্রেতা মিন্টু বলেন, ‘দেখেন, আমাদের করার কী আছে? আমি তাজা রুই-কাতলা মাছ বিক্রি করি। এসব মাছ সাধারণত উত্তরাঞ্চল থেকে আসে। আগে এই মাছ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতাম। বড় আকারের মাছের দাম ছিল ৩০০ টাকা কেজি। কিন্তু এখন দাম শুরু হচ্ছে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজি থেকে।’

 

তিনি বলেন, ‘আমাদেরই বেশি দামে মাছ কিনতে হচ্ছে। আগে মাছ ঢাকায় নিয়ে আসতে যে খরচ হতো, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। আমরাও তো মাছ লোকসানে বিক্রি করতে পারি না। আবার বেশি লাভও করতে পারি না।’

 

মিন্টুর ভাষ্য, মাছ বিক্রি করলেও তাঁর নিজেরও সংসার রয়েছে। তাঁকেও প্রতিদিনের খাবার কিনতে হয়। ফলে বাজারের বাড়তি দামের প্রভাব শুধু ক্রেতাদের ওপর নয়, বিক্রেতাদের ওপরও পড়ছে।

 

এদিকে সোমবার বাজারে সবজির দাম মোটামুটি অপরিবর্তিত ছিল। তবে কয়েক দিন আগের তুলনায় কিছু সবজির দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। বাজারে প্রতি কেজি পটল ৬০ টাকা, আলু ৩৫ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ টাকা, ধুন্দল ৬০ টাকা, ঝিঙা ৭০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

 

এ ছাড়া প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১৩০ টাকা, টমেটো ১৫০ টাকা, শিম ১২০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৫০ টাকা, ফুলকপি ৬০ টাকা, মুলা ৬০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

 

বিক্রেতারা জানান, কয়েক দিন আগেও কিছু সবজির দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। তখন কেজিপ্রতি কয়েকটি সবজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। টমেটোর দামও উঠেছিল প্রায় ২৫০ টাকা কেজিতে। বর্তমানে টমেটোর দাম কমে ১৫০ টাকায় নেমেছে। কাঁকরোল, ধুন্দল, ঝিঙা ও চিচিঙ্গার দামও কিছুটা কমেছে।

 

বরবটির দামেও স্বস্তি ফিরেছে। কয়েক দিন আগে প্রতি কেজি বরবটি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে সবজির দাম কিছুটা কমলেও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ কাটেনি।

 

খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি আটা, ময়দা, চিনি ও কাপড় ধোয়ার সাবানের দামও ক্রেতাদের বাড়তি চাপের মধ্যে ফেলেছে। বাজারে দুই কেজি ময়দার দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। প্যাকেটজাত আটার দাম ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে। খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।

 

গায়ে ব্যবহারের বিভিন্ন ধরনের সাবানের দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। এসব সাবানের দাম ধরনভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এক কেজি হুইল গুঁড়া সাবানের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা হয়েছে। আর হুইল কাপড় কাচার সাবানের দাম ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা হয়েছে।

 

চালের বাজারেও স্বস্তি নেই। বাজারে সর্বনিম্ন দামের গুটি স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ টাকায়। অন্যদিকে পোলাওয়ের চালের দাম প্রতি কেজি প্রায় ২০০ টাকা। ফলে সাধারণ পরিবারের জন্য প্রতিদিনের খাবারের খরচ সামলানোর পাশাপাশি বিশেষ দিনে একটু ভালো খাবারের আয়োজন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

অন্যান্য পণ্যের মধ্যে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। প্রতি ডজন ডিমের দাম ১০ টাকা কমে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে আদা ও রসুনের দাম বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি আদা ১৬০ টাকা থাকলেও এখন তা ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রসুনের দাম ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা হয়েছে।

 

ডালের বাজারেও দামের পার্থক্য রয়েছে। প্রতি কেজি মোটা মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। চিকন মসুর ডালের দাম ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। এসব পণ্যের দাম মিলিয়ে পরিবারের দৈনন্দিন খাবারের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

 

বাজার করতে আসা মানুষের অভিযোগ, কোনো একটি পণ্যের দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিকভাবে সংসারের ব্যয় কমছে না। কারণ, একটি পরিবারের শুধু চাল-ডাল কিনলেই চলে না। মাছ, সবজি, তেল, মসলা, ডিম, সাবানসহ নানা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয়। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় মাসের আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

বিশেষ করে অটোচালক, রিকশাচালক, দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষের পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাঁদের আয় প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভরশীল। কোনো দিন কাজ কম হলে আয়ও কমে যায়। কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম বেশি থাকায় প্রয়োজনীয় খাবার কেনার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগও সীমিত।

 

ক্রেতাদের আশঙ্কা, সামনে যদি আবারও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। এখনই যেখানে অনেক পরিবারকে খাবারের পরিমাণ ও ধরন নিয়ে হিসাব করতে হচ্ছে, সেখানে নতুন করে দাম বাড়লে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

 

তাঁদের মতে, বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং পরিবহন খরচসহ মূল্যবৃদ্ধির কারণগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

 

ক্রেতাদের প্রত্যাশা, সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। কারণ, বাজারের উচ্চমূল্য এখন আর শুধু কেনাকাটার সমস্যা নয়; এটি অনেক পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন, সন্তানদের চাহিদা পূরণ এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনের ইচ্ছা ও প্রয়োজনের মধ্যে বেছে নিতে হচ্ছে বহু মানুষকে। বাইরে থেকে তাঁদের জীবন স্বাভাবিক মনে হলেও বাড়তি খরচের চাপ, সন্তানদের চাহিদা পূরণ করতে না পারার কষ্ট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের নীরবে ভোগাচ্ছে। বাজারের প্রতিটি পণ্যের দামের সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকার লড়াই।

- Advertisement -spot_img
সর্বশেষ

ট্রাম্পের অনুমতির অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি

ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অভিযানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক সেনা মোতায়েন রাখা হয়েছে। এখন...