| Your Ads Here 100x100 |
|---|
আইনজীবীর ভুলের কারণে কোনো মক্কেলকে (বিচারপ্রার্থী) ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া উচিত নয় বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। জমির মালিকানা নিয়ে একটি মামলার আরজি তৈরির সময় আইনজীবীর ভুলের কারণে বাদী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মামলাটি পুনর্বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে উভয় পক্ষকে মামলার আরজি সংশোধন এবং প্রয়োজন হলে নতুন করে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিতে বলা হয়েছে।
‘মোহাম্মদ আসিফ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। জমির মালিকানা সংক্রান্ত ফাস্ট আপিলের শুনানি শেষে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। আট পৃষ্ঠার রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বুধবার (২৮ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
রায়ে আদালত বলেন, মামলার আরজি প্রস্তুত করার সময় সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ভুল করেছিলেন। এ ভুলের ক্ষেত্রে বাদীর কোনো ভূমিকা ছিল না। তাই তাঁর নিযুক্ত আইনজীবীর করা ভুল বা ত্রুটির কারণে বাদীকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া উচিত নয়।
যেভাবে শুরু হয় জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ
প্রকাশিত রায় ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মোহাম্মদ আসিফ ঢাকার ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন। তাঁর দাবি ছিল, জমিটি প্রসন্ন কুমার বসু ও অন্যদের মালিকানাধীন ছিল এবং সি.এস. খতিয়ান নম্বর ২৭১৫-এ জমিটির মালিকানা যথাযথভাবে নথিভুক্ত ছিল।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সি.এস. রেকর্ডে থাকা মালিকেরা ১৯৫২ সালের ১৮ জুন, ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৮ আগস্ট তারিখের নিবন্ধিত পাট্টা দলিলের মাধ্যমে জমিটি কাজী আবু সাঈদের কাছে হস্তান্তর করেন। পাট্টা দলিলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে জমি ভোগদখলের অধিকার দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে কাজী আবু সাঈদ নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে জমিটি হাজী সালাহউদ্দিন ও খলিল মিয়ার কাছে হস্তান্তর করেন। পরে খলিল মিয়া তাঁর অংশের জমি হাজী সালাহউদ্দিনের কাছে বিক্রি করেন।
তবে জমির পরিমাণ নিয়ে রেকর্ডে অসংগতি দেখা দেয়। মামলার নথি অনুযায়ী, মোট ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ জমির পরিবর্তে আর.এস. খতিয়ানে মাত্র ৫৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ জমি কাজী সালাহউদ্দিনের নামে রেকর্ড করা হয়। বাদীপক্ষের দাবি, জমির প্রকৃত পরিমাণের সঙ্গে রেকর্ডের এই পার্থক্য ছিল ভুলের ফল।
পরে ১৯৮৯ সালের ৩১ মে নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে হাজী সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ আসিফের কাছে ৬৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। আসিফ ওই জমিতে একটি কারখানা স্থাপন করেন এবং সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে জমি ভোগদখল করে আসছিলেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিটি জরিপের এক নম্বর খতিয়ানে জমিটি বিবাদীদের নামে রেকর্ড করা হয়। বাদীপক্ষের অভিযোগ, এই রেকর্ডও ভুল ছিল। এর ভিত্তিতে স্থানীয় তহশিলদার মোহাম্মদ আসিফের কাছ থেকে জমির খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেন।
এ পরিস্থিতিতে জমির সিটি জরিপের খতিয়ান ভুল ও অবৈধ ঘোষণার দাবিতে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন মোহাম্মদ আসিফ।
আইনজীবীর ভুলে মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হন বাদী
মামলার আরজি তৈরির সময় আইনজীবী জমির মালিকানা ও রেকর্ডের অসংগতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেননি বলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে, আর.এস. খতিয়ানে ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশ জমির পরিবর্তে ৫৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ জমি রেকর্ড হওয়ার বিষয়টি এবং পরবর্তী সময়ে সিটি জরিপের খতিয়ানে জমি বিবাদীদের নামে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি আরজিতে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আরজি প্রস্তুত করার সময় আইনজীবীর এই ভুলের কারণে বাদী মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। অথচ এ ভুলের জন্য বাদী নিজে দায়ী ছিলেন না।
২০১৭ সালের ১৫ জুন ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালত মামলাটি খারিজ করে রায় ও ডিক্রি দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মোহাম্মদ আসিফ ২০১৮ সালে হাইকোর্টে ফাস্ট আপিল করেন। ওই আপিলের শুনানি শেষে মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত দেন।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পুনর্বিচারের নির্দেশ
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, আপিলকারীর আইনজীবীর বক্তব্য এবং সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, মামলার আরজি প্রস্তুত করার সময় আইনজীবী ভুল করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বাদীর কোনো ভূমিকা ছিল না। ফলে আইনজীবীর ভুলের কারণে মক্কেলকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভোগান্তির শিকার হতে দেওয়া উচিত নয়।
আদালত আরও বলেন, মামলার সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র বিবেচনায় উভয় পক্ষকে নিজেদের আরজি সংশোধন করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে মামলাটি আবার বিচার করা হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
এসব বিবেচনায় হাইকোর্ট ফাস্ট আপিলটি মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া আগের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে দেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উভয় পক্ষকে আরজি সংশোধন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে মামলাটি নতুন করে বিচার করতে হবে। এ আদেশের অনুলিপি পাওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে দ্রুত মামলাটির বিচারকাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম জেলা জজ আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মামলার নথিপত্র অবিলম্বে অধস্তন আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালতে মোহাম্মদ আসিফের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বিলকিস নাসিমা রহমান, মো. আবদুস সালাম ও মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন সিদ্দিক। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান।

