জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা তার হুমকি দিতে পারে না। এই বিধানের আলোকে দেখলে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে আন্তর্জাতিক আইনেও কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক আইনে আত্মরক্ষার অধিকার কিংবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকলে কোনো রাষ্ট্র অন্য দেশের ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালাতে পারে। কিন্তু সেই অভিযানের অংশ হিসেবে কাউকে জোরপূর্বক তুলে এনে অন্য দেশে বিচারের মুখোমুখি করা—এটি আইনগতভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত ও ধূসর একটি ক্ষেত্র।
এই ঘটনায় মূলত দুটি প্রশ্ন সামনে আসে—একটি হলো ভিনদেশের ভূখণ্ডে সামরিক হামলার বৈধতা, অন্যটি হলো সেখান থেকে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে আনার আইনি ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্র যে আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরছে, সেটিই প্রথমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
আত্মরক্ষার যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা
গত কয়েক মাসে ক্যারিবিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত একাধিক অভিযানের সময় দাবি করা হয়, ছোট নৌযানগুলোতে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা মাদক পরিবহন করা হচ্ছিল। এসব অভিযানের পরপরই সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সেবনে মৃত্যুর প্রসঙ্গ সামনে আনেন। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে—এই মাদক মার্কিন নাগরিকদের জীবন ধ্বংস করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।
তবে মাদক সেবনে মৃত্যুর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ট্রাম্প প্রকাশ করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোকেইনের কারণে মারা গেছে প্রায় ২৯ হাজার ৪৪৯ জন। অন্যদিকে, ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য বলছে, শুধু ফেন্টানিল সেবনে ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ৭২ হাজার মানুষের, আর ২০২৪ সালে তা ছিল ৪৭ হাজারের বেশি।
এই পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মাদক সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরলেও, নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে এই মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক কতটা—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক পাচার’-এর অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের কাছে আগ্রাসী পদক্ষেপের জন্য এক ধরনের আবেগীয় বৈধতা তৈরি করতে পারে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে আনার পর মাদুরোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদক চোরাচালানের অভিযোগেই গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
তুলে আনার আইনি জটিলতা
জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী অন্য দেশের ভূখণ্ডে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে দেশটির সংবিধানগত কাঠামোর কারণে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন দিলে সেটি দেশটির অভ্যন্তরীণ আইনের অংশে পরিণত হয়। তবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে।
মার্কিন আইনবিদদের একাংশের মতে, সংবিধান কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইনের সীমা অতিক্রম করে বিদেশে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দেয়। উদাহরণ হিসেবে ১৯৮৯ সালে পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা তুলে ধরা হয়।
মার্কিন বিচার বিভাগের অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সেল (ওএলসি) ওই সময় যুক্তি দিয়েছিল, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনো পলাতককে গ্রেপ্তারের জন্য বিদেশে এফবিআই পাঠানোর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে—even যদি তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে মার্কিন আইনবিশেষজ্ঞদের মধ্যেও তীব্র বিতর্ক রয়েছে।
উল্লেখ্য, নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাকে ধরিয়ে দিতে ৫ কোটি ডলার পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
মাদকের অভিযোগ কতটা বিশ্বাসযোগ্য
যুক্তরাষ্ট্র, কলম্বিয়া এবং জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বেশিরভাগ কোকেন উৎপাদিত হয় কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায়। এই কোকেনের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় রুট দিয়ে—যার হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। ক্যারিবিয়ান সাগর দিয়ে আসে মাত্র ১৬ শতাংশ।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মাদক সাধারণত প্রথমে মেক্সিকোতে পৌঁছে, এরপর স্থলপথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে। ভেনেজুয়েলা কলম্বিয়ার প্রতিবেশী হলেও দেশটি থেকে ঠিক কত পরিমাণ কোকেন পাচার হয়—সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
ফেন্টানিল পাচারের ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলার সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে না। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ), বিচার বিভাগ ও কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ফেন্টানিলের বড় অংশ তৈরি হয় মেক্সিকোতে, যার রাসায়নিক উপাদান আসে মূলত এশিয়ার দেশগুলো থেকে—বিশেষ করে চীন।
এই প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এবং জনসমক্ষে থাকা তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও গ্রেপ্তারের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।