ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। আগামী মার্চ মাসে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা, যা বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তিনটি ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আপাতত কোনো বিদেশি ঋণ অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামীকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি, নৌ চলাচল, সুন্দরবন ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই ক্ষতি মোকাবিলায় শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রবাহ বাড়ানোই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য।
ব্যারাজটি বাস্তবায়িত হলে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়াও হাইড্রো পাওয়ার প্লান্ট থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ব্যারাজের ওপর দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলওয়ে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পের মান নিশ্চিত করতে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষার জন্য একটি ডেডিকেটেড ল্যাব স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া কারিগরি সহায়তায় যুক্ত থাকবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এমন একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হতে পারে। তাঁর মতে, ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন বিষয়ে সুস্পষ্ট সমঝোতা ছাড়া এই ব্যারাজ কার্যকর হবে না। এমনকি পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না হলে বড় কোনো উন্নয়ন সহযোগীও প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাবে না।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টকে ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট, নেভিগেশন লক ও ফিশ পাস। এর মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্ন অববাহিকায় পানির সুষম বণ্টন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদের সুপারিশ করেছে। বিভাগীয় সদস্য সচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তথ্য ও ব্যয় কাঠামো সংশোধন জরুরি।
ডিপিপি অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ চালু হলে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক নদীর প্রবাহ ফিরবে, লবণাক্ততা কমবে এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।