দ্রুত, কম খরচে এবং অধিক সংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাত। এ লক্ষ্য পূরণে গাড়ি, তেল-গ্যাস এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ কাজে লাগাচ্ছে দেশটির একাধিক প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামরিক অভিযানের কারণে রকেট মোটর ও ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে প্রচলিত প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপগুলোও উৎপাদন বাড়াতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ৫০ হাজারেরও বেশি রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেটচালিত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এই চাহিদা পূরণে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৫৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে এবং ক্রয় প্রক্রিয়াও সহজ করেছে।
তবে লকহিড মার্টিন, বোয়িং ও আরটিএক্সের মতো বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, রকেট মোটরের ঘাটতি উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ ক্যাস্টিলিওন ক্ষেপণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গাড়ি শিল্পে ব্যবহৃত উন্নতমানের ইলেকট্রনিক চিপ ব্যবহার করছে। কোম্পানিটির দাবি, এসব চিপ মহাকাশ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কম দামে পাওয়া যায় এবং সংগ্রহ করতেও উল্লেখযোগ্যভাবে কম সময় লাগে। একই সঙ্গে তারা তেল ও গ্যাস শিল্পে ব্যবহৃত উচ্চচাপ সহনশীল ধাতব পাইপ রকেট মোটরে ব্যবহার করছে, যা কম খরচে সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আন্দুরিল রকেট জ্বালানি তৈরিতে ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত ব্লেডবিহীন মিক্সিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে কয়েক ঘণ্টার কাজ কয়েক মিনিটে সম্পন্ন হচ্ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
রকেট মোটর উৎপাদনে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। নর্থরপ গ্রুম্যানের গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপনের সময় প্রায় এক বছর থেকে কমে মাত্র ছয় সপ্তাহে নেমে আসে।
নিউ মেক্সিকোভিত্তিক এক্স-বো সিস্টেমসও থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে কম খরচে রকেট মোটর তৈরি করছে। কোম্পানিটির ভাষ্য, নতুন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে আগে যেখানে তিন থেকে ছয় বছর লাগত, এখন তা প্রায় এক বছরের মধ্যে সম্ভব হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি পেন্টাগনের কাছ থেকে ১৯১ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও পেয়েছে।
এদিকে ফায়ারহক অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, তাদের নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে রকেটের জ্বালানি তৈরির সময় ৬০ দিন থেকে কমে মাত্র সাত ঘণ্টায় নেমে এসেছে। এতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় এক-দশমাংশ খরচে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও রকেট মোটর উৎপাদনে কাস্টিং, কিউরিং, বেকিং, এক্স-রে পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল ধাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি কিউরিং ওভেন, এক্স-রে সরঞ্জামের সীমিত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয়চুক্তির অনিশ্চয়তাও নতুন স্টার্টআপগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে রয়েছে।