29.3 C
Dhaka
রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬

বালিশকাণ্ডের পর এবার গণপূর্তের শীর্ষ চেয়ারে মূলহোতা! নেপথ্যে কী?

জনপ্রিয়
- Advertisement -
Your Ads Here
100x100

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া, ২০১৯ সালের আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি, বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্য, নথি জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট নথি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে খালেকুজ্জামান সুবিধা নিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রূপপুরের গ্রিন সিটি ও ‘বালিশকাণ্ড’

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ওই সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের বিভিন্ন ভবন নির্মাণের টেন্ডার ও কার্যাদেশের প্রক্রিয়া এগোয়।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে ২০১৯ সালে গ্রিন সিটি প্রকল্পে আসবাবপত্র ও বালিশসহ বিভিন্ন সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।

তখন খালেকুজ্জামান রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, বালিশকাণ্ডে অপেক্ষাকৃত নিচের সারির কয়েকজন প্রকৌশলী দায়ের মুখে পড়লেও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তারা তুলনামূলকভাবে রক্ষা পান।

রূপপুরের বালিশকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্বাভাবিক দামে বালিশ কেনার বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

জাল পিএইচডি সনদের অভিযোগ ও বিভাগীয় শাস্তি

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুয়া পিএইচডি সনদ ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এক বছরের জন্য তার বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছিল।

তবে শাস্তির কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ধারাবাহিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। এ নিয়ে গণপূর্তের ভেতরে প্রশ্ন রয়েছে—শাস্তিপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তার এত দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হওয়ার পেছনে প্রভাব বা সুপারিশ কাজ করেছিল কি না।

রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ

খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তার রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনৈতিকভাবে নিজের অবস্থানও পরিবর্তন করেছেন।

একসময় আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ উঠলেও পরবর্তী সময়ে তাকে জামায়াতঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবার বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাঁচজনকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব

২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে মো. শামীম আখতারকে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে দেওয়া হয়। একই সময়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর তাকে চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার চেয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা সিনিয়র ছিলেন।

এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে খালেকুজ্জামান প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পেলেন?

সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে এই পদায়ন হয়েছে। যদিও এ দাবির পক্ষে প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত প্রমাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ

প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তার বিরুদ্ধে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। এমনকি একদিনে অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীকে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে এসব বদলির বড় অংশ বাতিল করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকাশ্য বদলি স্থগিত হলেও পরবর্তী সময়ে ছোট পরিসরে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অনৈতিক লেনদেন চলেছে।

টেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন

বদলির পাশাপাশি বড় প্রকল্পের টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকটি বড় দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নামে আটকে রাখা হয়েছিল। যদিও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস বা পিপিআরের ত্রুটিকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রকৃত কারণ ছিল কমিশন-সংক্রান্ত বিরোধ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ সময় অবস্থান

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর চাকরিজীবনের বড় একটি সময় অস্ট্রেলিয়ায় কাটানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে।

নথিপত্র নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষা ছুটি, প্রেষণ ও অন্যান্য ছুটির সুযোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেছেন। এমনকি অনুমোদিত ছুটির বাইরে সেখানে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন

২০২৪ সালে রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। পরে ভবনটির নকশা ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।

রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম জড়িত ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, ভবনটির নকশায় জরুরি বহির্গমনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে ছিল না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নকশা অনুমোদনের সময় এসব বিষয় কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

‘সিন্ডিকেট’ নিয়েও অভিযোগ

গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, বর্তমানে বদলি, পদোন্নতি ও টেন্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।

এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে খালেকুজ্জামান চৌধুরী রয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তার সঙ্গে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার নামও তারা উল্লেখ করেছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আত্মীয়দের ঠিকাদারি ব্যবসার অভিযোগ

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দায়িত্বকালে তার আত্মীয়স্বজনের ঠিকাদারি ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তার ভাই, ভাগিনা ও অন্যান্য আত্মীয় পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি গণপূর্তের বিভিন্ন বিভাগের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের একটি ডেভেলপার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তার আত্মীয়স্বজন সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজে যুক্ত থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বাদ দিতে মামলার ব্যবহার?

প্রধান প্রকৌশলীর পদটি স্থায়ী করার প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা-সংক্রান্ত তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড বা এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। এতে তাদের পদোন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত করে খালেকুজ্জামানকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নও উঠেছে।

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন।

দুদকে অভিযোগ

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দালিলিক প্রমাণসহ দুদকে অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

তদন্তের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে পদায়ন ও পদোন্নতির আগে তার সার্ভিস রেকর্ড এবং অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খানও এমন কর্মকর্তাদের বিষয়ে গভীর ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

খালেকুজ্জামানের বক্তব্য কী?

এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে পাওয়া না যাওয়ায় মোবাইল ফোনে কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে; আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রমাণ সামনে আসাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

- Advertisement -spot_img
সর্বশেষ

চ্যানেল ওয়ানের কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেলেন এফ এম সুমন

    প্রেসবিজ্ঞপ্তি: দেশের জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল ওয়ান-এর কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাংবাদিক এফ এম সুমন। সম্প্রতি চ্যানেল...