31 C
Dhaka
বুধবার, আগস্ট ১৯, ২০২৬

ধ্রুপদি অধ্যাপক যতীন সরকারের জীবনাবসান

জনপ্রিয়
- Advertisement -
Your Ads Here
100x100
খবরের দেশ ডেস্ক :
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে গতকাল বুধবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে শেষবারের মতো শ্বাস নিলেন   । তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে ধ্রুপদি সুসংস্কৃত সংগ্রামসফল একটি যুগের যবনিকাপাত ঘটল। বর্তমান তার সাক্ষী হয়ে রইল।
অনাগত প্রজন্ম তাঁর মননশীল সাহিত্যের বিপুলা সম্ভারের ভেতর ভাষায় ভাষ্যে ও আদর্শে আরও শতবর্ষ তাঁর অস্তিত্ব খুঁজে পাবে। এমন অগ্রজ পেয়ে তাদের মনে গৌরব জন্মাবে। যারা এখনও বর্তমান, তাঁর উচ্চারিত অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছে, ইতিহাসের সমাকলন শিখেছে, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কেবল তাদের।
রাজধানী থেকে আড়ালে থাকতে চাইতেন, আড়ালেই থেকেছেন শেষতক। তথাকথিত শিল্প-সংস্কৃতি, রাজনীতির কেন্দ্রটিকে উপেক্ষা করে, ঋষির চোখে, ঘটনাস্রোতকে একটু দূর থেকে পর্যবেক্ষণের জন্যেই হয়তো এই উপযুক্ত আড়াল বেছে নিয়েছিলেন। ঋষিই তিনি। বাড়ির নাম ‘বানপ্রস্থ’, ধন্য। হ্যাঁ, রাজধানীর ক্ষ্যাপা কিশোররা তাঁর সরাসরি সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে তাঁর রচনা থেকে নয়। চার দশকেরও বেশি সময়ের লেখক জীবন তাঁর। সাম্যবাদের আদর্শে আহিত, সংগ্রামের প্রেরণারসে অমিয়।
শেষদিকে আর কণ্ঠ চিনতে পারতেন না ফোনে আগের মতোন। বলতেন, ‘আপনার সঙ্গে কি আগে কখনও কথা হয়েছে? আমাকে কীভাবে চেনেন?’ বলতে পারতাম, জীবন্ত কিংবদন্তিকে যেভাবে চেনে তাঁর ভাব-শিষ্যশাবকরা, সেভাবে। বলা হয়নি। স্বদেশি সংগ্রামের বিপ্লবী বাঘা যতীনের পর, নতুন সময়ের অনুক্রমে আমরা আরেক বিপ্লবী যতীনকে পেয়েছিলাম বাংলাদেশোত্তর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ময়দানে। জীবনের বিপুলা কৃতি কি তিনি বিস্মৃত হয়েছিলেন?
কিছু কিছু মনে পড়ত। আলাপ খানিক এগোতেই সেই প্রথম ও দ্বিতীয় তারুণ্যের দিনগুলোয় ফিরে যেতেন। দিনগুলো যেন চোখের সামনে সংক্রান্তির শেষ যাত্রাপালার দলের মতো হেঁটে যাচ্ছে। বালকের ব্যগ্র আগ্রহী চোখে তাদের দেখছেন তিনি। বার্ধক্যসুমিষ্ট কণ্ঠে বলে যাচ্ছেন ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গোপন সভার কথা। ঝাপসা চোখে, উপশ্রুতি-ভরসায় জুলাই অভ্যুত্থান দেখেছেন, শুনেছেন। স্বপ্ন ছিল তাঁর, আক্ষেপও বেজেছে। চব্বিশ সালের ষোলই ডিসেম্বর সমকালকে দেওয়া শেষ সাক্ষাৎকারে স্বপ্ন ও আক্ষেপ দুটোই ব্যক্ত হয়েছিল। টেলিফোনের ওপারে তাঁর আন্তরিক কণ্ঠটি আর শুনতে পাব না।
ব্যক্তি যতীন সরকার সরে গেছেন, এবার ব্যক্ত যতীন সরকারকে নিয়ে ক্রমশ অনেকে বিস্তৃত আলাপ করবেন। অতীতের যতীনীয় সময়রেখা ধরে খানিকটা হেঁটে আসা যাক।
১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে জন্ম। ১৯৫৪ সালে মেট্রিকুলেশন পাসের পর ভর্তি হলেন নেত্রকোনা কলেজে। ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজ থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। সে বছরেই ময়মনসিংহের গৌরীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে অধ্যাপনায় যোগদান। এই সময় থেকে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর ভূমিকা ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠতে থাকে।
সাম্যবাদী দর্শনের সার বিন্যস্ত তাঁর বিপুলায়তন মননশীল সাহিত্যকর্মের শুরু থেকে শেষাবধি। ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী। তখন স্কুলছাত্র। ছিলেন মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে, বৌদ্ধিক সংগ্রামী। তখন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তরুণ বয়স থেকে বিস্তর লেখাপত্রের সুবাদে তাঁর পাঠকমহল বিস্তৃত ছিল। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হলো ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’। ব্যস, দেশজুড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে সাড়া পড়ে গেল। তবে তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো রচনা ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’। ২০০৫ সালে প্রকাশিত।
‘দ্বিজাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান-চেতনা’, ‘সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবী সমাচার’, ‘সাহিত্য নিয়ে নানাকথা’, ‘সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রত্যাশা’, ‘প্রান্তির ভাবনাপুঞ্জ’, ‘বাংলাদেশের কবিগান’, ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই-উতরাই’, ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’, ‘প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা’–অসংখ্য তাঁর গ্রন্থ। গ্রন্থকার জীবন একটু দেরিতে শুরু হয়েছে। কিন্তু শুরু করার পর অবিশ্রাম। বহুপ্রজ। ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই-উতরাই’ গ্রন্থের জন্য ২০১৮ সালে ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭’ লাভ করলেন। এর আগে ২০০৫ সালে ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ গ্রন্থের জন্য ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ পুরস্কার’ লাভ করেছিলেন।
বরেণ্য এ প্রতিভাকে রাষ্ট্র সম্মাননা জানাতে ভোলেনি। ২০০৭ সালে পান ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পদক’ এবং ২০১০ সালে ভূষিত হন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদকে’।
দুই মেয়াদে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষাবধি, দুর্বল শরীরে, ক্ষীণ দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি নিয়েও, যথাসাধ্য লেখালেখি চালিয়ে গেছেন পত্রপত্রিকায়। দৈনিক সমকালে একুশে ফেব্রুয়ারি দু হাজার পঁচিশে ‘একুশ ও একটি স্বপ্ন’ শিরোনামে তাঁর সর্বশেষ লেখা প্রকাশিত হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে লেখাটি ছিল শ্রুতিলিখন।
দেশজুড়ে, অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের পরিণতি দান-কল্পে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা অধ্যাপক যতীন সরকার, নব্বই বছরে পদার্পণের চার দিন আগে আমাদের ছেড়ে গেলেন। স্থানীয় সাংবাদিক জানালেন, ৮ আগস্ট থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন তিনি।
অবশেষে গতকাল দুপুরে চিকিৎসকরা শেষ বার্তা দিলেন। তাঁর মরদেহ ময়মনসিংহে উদীচী জেলা কার্যালয়ে গতকাল বিকেল ৪টায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। পরে সেখান থেকে নেত্রকোনায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নেওয়া হয়। তাঁকে ছাড়া আসছে ১৮ আগস্ট কীভাবে উদযাপিত হবে, সেটি কল্পনার দুঃসাহস তাঁর অনুরাগীদের নেই।
- Advertisement -spot_img
সর্বশেষ

জনবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এনবিআরকে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

রাজধানীতে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আরও দক্ষ, কার্যকর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কর্মকর্তাদের প্রতি...