খবরের দেশ ডেস্ক :
ইংল্যান্ডের বিশ্ববন্দিত বিশ্ববিদ্যালয় কেমব্রীজ ইউনির্ভাসিটির গণিত শাস্ত্রের সর্বোচ্চ উপাধি হল “র্যাংলার”৷মেধাবী আনন্দমোহন বসু প্রথম ভারতীয় তথা বাঙালি যিনি ১৮৭৪সালে গণিতের তিনটি পরীক্ষা দিয়ে প্রতিবারই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘র্যাংলার’ উপাধি অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশদের শোষণ আর শাসনকে অতিক্রম করে এক তরুণ বঙ্গসন্তানের ইংল্যান্ডের গণিত শাস্ত্রে সর্বোচ্চ ‘র্যাংলার’ উপাধি লাভ সেইসময়ের প্রেক্ষিতে মোটেই সহজ ছিল না,কিন্তু আনন্দমোহন বসুর পাণ্ডিত্য এতটাই উচ্চমার্গীয় প্রতিভাকে দমিয়ে রাখা যায়নি,বরং বলা শ্রেয় তাঁর সাফল্য আসলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পরাধীন ভারতের মানুষের এক বিপুল বিজয়৷
ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী, ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ১৮৬২সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় নবম স্থান অধিকার করে এনট্রান্স পরীক্ষা পাশ করেন। কলকাতায় এসে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে৷সেখান পরীক্ষায় আনন্দমোহন বসুর সাফল্য সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়৷ এফ.এ, ও বি.এ,পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার৷অসাধারণ রেজাল্টের জন্য ১৮৭০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছিলেন “প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি৷ উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমালেন বিদেশে,গন্তব্য ইংল্যান্ড,সাবজেক্ট গণিতশাস্ত্র৷
শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক আনন্দমোহনকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে বাঙালি জাতি৷ নারীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে তিনি সকলকে উদাত্ত কন্ঠে আহ্বান জানান। ১৮৭৬ সালে কলকাতায় ‘বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এই বিদ্যালয়টিকে অবশ্য বেথুন স্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়৷ ১৮৭৯ সালে আনন্দমোহন বসু প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতার সিটি কলেজ,বাংলাদেশের “আনন্দমোহন কলেজের” প্রতিষ্ঠাতা তিনি ৷
‘বঙ্গমহিলা মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে পরে অবশ্য বেথুন স্কুলের সংযোগ ঘটানো হয়।বেথুন স্কুলের দুই ছাত্রী কাদম্বিনী বসু ও সরলা দাশ, আনন্দমোহন বসু ও দুর্গামোহন দাসের বিশেষ উদ্যোগে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবার উপযুক্ত বিবেচিত হলেন। ১৮৭৮ সালে প্রথম মহিলা হিসেবে কাদম্বিনী বসু এন্ট্রান্স পাশ করার গৌরব অর্জন করেন৷ কার্যত এভাবেই বাংলায় নারী শিক্ষার দুয়ার খুলে যায়৷এরও কিছু পরে আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, দুর্গামোহন দাস, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখের আন্দোলনে ১৮৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাভের দাবি মেনে নেয় এবং ১৮৮২ সালে কাদম্বিনী বসু ও চন্দ্রমুখী বসু প্রথম মহিলা স্নাতক হবার গৌরব অর্জন করেন।
‘বেঙ্গল প্রভিনসিয়াল’ কমিটির মাধ্যমে আনন্দমোহন বসু ১৮৮১-৮২ সালে ছাত্রীদের জন্য হোস্টেলেরও ব্যবস্থা করেছিলেন৷সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার বয়স কমিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মঞ্চ হিসাবে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে শিবনাথ শাস্ত্রী, নীলকমল মিত্র প্রমুখের সহায়তায় ১৮৭৬-এর ২৬ জুলাই ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘ভারতসভা’ প্রতিষ্ঠিত হয়।সংগঠনের প্রথম সম্পাদক ছিলেন আনন্দমোহন বসু।
রাজনীতির প্রতি বরাবর অমোভ আকর্ষণ ছিল,মূল ধারার রাজনীতিতে যোগ দিয়ে আনন্দমোহন বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন ১৮৯৮ সালে৷বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধীতা করেছিলেন৷ এমন কি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন । শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই সভায় অনুপস্থিত ছিলেন৷ আনন্দমোহন বসুর হয়ে সেই সভায় সভাপতির বক্তব্য পাঠ করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আর এক প্রখ্যাত মানুষ তিনি রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। প্রগতিশীল হৃদয়,সমাজকর্মী, শিক্ষানুরাগী, বিচক্ষন রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গীয় নবজাগরণে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন আনন্দমোহন বসু