মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বাংলাদেশের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্কহার হ্রাসের বিষয়ে দরকষাকষি করতে গিয়ে সে দেশের সঙ্গে যে গোপন চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে কিনা, সে প্রশ্ন উঠছে।? ধারণা করা যায়, এতে এমন কিছু বিষয় আছে, যে জন্য জনঅসন্তুষ্টি ও সম্ভাব্য প্রতিবাদের ভয়ে এটি প্রকাশ করা হচ্ছে না। এর উত্তরে অবশ্য সরকার ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ছাড়া এটি প্রকাশ করা যাবে না। বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির বিষয়বস্তু এ দেশের জনগণ জানতে পারবে না বা তা প্রকাশ করতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি লাগবে কেন?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এরূপ চুক্তি সম্পাদনের প্রয়োজন কেন হলো? জবাবে সরকার হয়তো শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করতেই এটি করতে হয়েছে। কিন্তু ভিয়েতনাম কোনো গোপন চুক্তি না করে কিংবা বিনা দরপত্রে উড়োজাহাজ, গম, তুলা, মাংস ইত্যাদির মতো পণ্য কেনার অঙ্গীকার না করেও বাংলাদেশের আগেই নিজেদের জন্য মার্কিন শুল্কহার ৪৬ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে তাদের পেশাদারিত্বমূলক দরকষাকষি ও নিপুণ কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে।
এ ধরনের আকস্মিক সমস্যার সমাধানে কিংবা সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেশাদারিত্বসুলভ আচরণ রক্ষার ক্ষেত্রে তারা কতটা বিচক্ষণ ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বসম্পন্ন তা বুঝার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের এতদসংক্রান্ত ঘোষণার পরমুহূর্তে ভিয়েতনাম কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ২ এপ্রিল ওয়াশিংটন সময় বিকেল ৪টায় ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বর্ধিত শুল্কহার ঘোষণার পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে ভিয়েতনাম এ বিষয়ে ধারণাপত্র তৈরি করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কর্তৃক ওই ঘোষণার চারদিন পর ৬ এপ্রিল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এ বিষয়ে যা কিছু করার তা প্রধান উপদেষ্টাই করবেন।
কাজটি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ও অংশত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হলেও এ সময়ে এটি নিয়ে কাজ করেছেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা। ফলে সমন্বয়হীনতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। মার্কিন প্রশাসনেরও সেটি বুঝতে এতটুকু বিলম্ব হয়নি এবং তারই সুবাদে বাংলাদেশকে চরমভাবে হতাশ করে ৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশের হ্রাসকৃত শুল্কহার ৩৭ শতাংশের জায়গায় মাত্র ২ শতাংশ কমিয়ে হবে ৩৫ শতাংশ।
তবে ৩১ জুলাইয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র যে বাংলাদেশের ওপর বর্ধিত শুল্কহার শেষ পর্যন্ত ২০ শতাংশে নির্ধারণ করল, সেটি ঘটেছে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার গোপন চুক্তির ফলাফল হিসেবে, যে চুক্তির কোনো কিছু সম্পর্কে এ দেশের জনগণ এখন পর্যন্ত কিছুই জানে না। চুক্তির পাশাপাশি বিনা দরপত্রে ও অধিকতর উচ্চমূল্যে উড়োজাহাজ, গম, তুলা, মাংস ইত্যাদি ক্রয়েরও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তারা একবারের জন্য হলেও কি হিসাব করে দেখেছেন, শুল্কহার হ্রাসের কারণে রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে পরিমাণে লাভবান হবে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমূল্যে ওইসব অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার কারণে শেষ পর্যন্ত তার চেয়েও বেশি বা প্রায় সমান অর্থ বাংলাদেশের কোষাগার থেকে চলে যাবে কিনা? চুলচেরা হিসাব-নিকাশের ফলাফলে তেমনটি হওয়ার আশঙ্কাই সর্বাধিক এবং সেটি হলে শুল্কহার কমিয়ে লাভবান হওয়ার মাত্রা অতি নগণ্য হবে বলেই ধারণা করা চলে।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এখন হয়তো আগের ১৫ শতাংশের সঙ্গে বর্ধিত ২০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত করে রপ্তানি আয়ের হিসাব-নিকাশ করবেন। কিন্তু মধ্যবর্তী পর্যায়ে গিয়ে গোপন চুক্তির শর্ত হয়তো জানান দেবে, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের আগের শুল্কের সঙ্গে রপ্তানিপণ্যের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও পুঁজির উৎস যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দ তালিকাভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে আরও বাড়তি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। সে অবস্থায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের বিপদের মধ্যে পড়বেন না কি?
এ অবস্থায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের বিবেচনায় তো বটেই, এমনকি নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা, কর্মকৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণের প্রয়োজনে উল্লিখিত গোপন চুক্তির তথ্যাদি জনসমক্ষে প্রকাশ করাটা জরুরি বলে মনে করি। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে চুক্তির বিষয়াদি জনসমক্ষে প্রকাশ করার বিষয়ে বন্ধুপ্রতীম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যেন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে।