গাজা সিটি খালি করতে স্থল ও আকাশপথে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। এই এলাকায় অন্তত ১০ লাখ লোকের বাস। ইসরায়েলি বাহিনী বোমা, গোলা ও ট্যাঙ্ক নিয়ে হানা দিচ্ছে। বাসিন্দারা প্রাণে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। খাদ্য সরবরাহে অবরোধ অব্যাহত রাখায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী-শিশুরা ধুঁকছেন। ছয় মাস ধরে গাজার আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা দুর্ভিক্ষের মধ্যে রয়েছেন। বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের তাঁবুতে গতকাল রোববার ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে একজন শিশু নিহত হয়েছে।
ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, ইসরায়েল সামরিক অভিযান তীব্রতর করার সঙ্গে সঙ্গে গাজার শিশুদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটি এক এক্স পোস্টে লিখেছে, ‘গাজার শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে না। তারা নিরাপদ জায়গা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কিন্তু দখলদাররা কোথাও তাদের জন্য নিরাপদ জায়গা রাখেনি। ঘরহীন শিশুরা পথে পথে ঘুরছে।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি অবরোধের ফলে পরিবারগুলো আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পর্যাপ্ত তাঁবু নেই। হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারের নিশ্চিত গন্তব্য নেই। তাদের অজানা গন্তব্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
গাজা শহরের আশপাশে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও বন্দুকযুদ্ধে ১৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনায় বসার প্রাক্কালে বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ১৩ ত্রাণপ্রত্যাশীকে হত্যা করা হয়েছে। গাজা শহরের শেখ রাদওয়ানপাড়ার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শনিবার রাতভর ও রোববার সকালে তারা ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের গোলা এবং বিমান হামলায় পড়েন। এতে অনেক পরিবার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ইসরায়েলি সেনারা পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করছে। বাসিন্দাদের এলাকাছাড়া করতে আকাশ ও স্থল থেকে বোমাবর্ষণ করছে তারা।
গার্ডিয়ান জানায়, শনিবার রাতে তেল আবিবে বিশাল জনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং রোববার সকালে গাজায় হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের পরিবার ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বাড়ির বাইরে বিক্ষোভ করেছে। গতকাল হামাস গাজায় তাদের নেতা মোহাম্মদ সিনওয়ারের (ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভাই) মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আলজাজিরা জানায়, গাজার অনেক মা জানিয়েছেন, অপুষ্টিতে বুকে দুধ না থাকায় তারা শিশুদের পানি খাইয়ে পেট ভরাচ্ছেন। বর্তমানে গাজায় শিশুখাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বাচ্চাদের খাবার চরম সংকটে পড়েছে। বেশির ভাগ মায়েরা বাচ্চাদের পেট ভরাতে পানি খাওয়াচ্ছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় ৮৮ জন নিহত ও ৪২১ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০ ত্রাণপ্রত্যাশী রয়েছেন। গত ২২ মাসে এ পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৪৫৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও এক লাখ ৬০ হাজার ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। এক দিনে ক্ষুধা-অপুষ্টিতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুধায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
ড্রোনগুলো যেন একটা শাস্তি
গাজার দেইর আল বালাহে এক নারীর দৈনন্দিন জীবনের ডায়েরি পাওয়া গেছে। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘গাজায় ড্রোনের উপস্থিতি অসহ্য হয়ে উঠেছে। এসব ড্রোন ২৪ ঘণ্টা ওড়াউড়ি করে। যখন এগুলো নিচে নেমে আসে, তখন কী পরিস্থিতি ঘটতে যাচ্ছে তা সবাই জানে। ড্রোনের শব্দ অবিরাম যেন বাসিন্দাদের বুকে আঘাত করেই চলে। গাজার বাসিন্দাদের জীবনে এটি একটি অনিবার্য পরিস্থিতি।’ ২৪ বছর বয়সী তাসনিম আল ইভিনি নামে ওই নারী লিখেছেন, ‘ড্রোনের শব্দে আপনি ভাবতে পারবেন না, ঘুমাতে পারবেন না।’
গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে ত্রাণবাহী নৌবহরের যাত্রা
সুইডিশ জলবায়ু প্রচারক গ্রেটা থুনবার্গসহ মানবিক সহায়তা এবং কর্মীদের বহনকারী একটি নৌবহর রোববার বার্সেলোনা ত্যাগ করেছে। বহরটির নাম ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’। এটি আগামী ৪ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, ‘গাজার অবৈধ অবরোধ ভাঙার’ চেষ্টা হিসেবে এই কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি মানবিক করিডোর খুলতে ও ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চলমান গণহত্যা বন্ধ করতে বহরটি স্প্যানিশ বন্দর শহর থেকে যাত্রা করেছে।