সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও আধুনিক করতে নতুন করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ দিতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রধান কামরুজ্জামান।
তিনি জানান, বাংলাদেশে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কারের ধারাবাহিকতা শুরু হয় ২০০৩ সালের সরকারি ক্রয় প্রবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে। এরপর ২০০৬ সালে সরকারি ক্রয় আইন এবং ২০০৮ সালে সরকারি ক্রয় বিধিমালা করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে আইন ও বিধিমালায় সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) একটি স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এতে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব ও কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বিপিপিএ প্রধান বলেন, সরকারি ক্রয়ে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পুরো ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করাই এখন অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই দশকে বেড়েছে সরকারি ক্রয়ের বাজার
কামরুজ্জামানের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে সরকারি ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৩ সালে সরকারি ক্রয়ের বার্ষিক বাজার ছিল প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়ায়। বর্তমানে এই বাজারের আকার প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
জাতীয় বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ক্রয়ের পরিমাণও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ই-জিপিতে অগ্রগতি
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরে ই-জিপি বা ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ই-জিপির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বিপিপিএর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও ক্রয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তিনটি অংশীজন পরামর্শ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এসব কর্মশালা থেকে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পাওয়া গেছে বলে জানান বিপিপিএ প্রধান।
ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১০ সালে একটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করতে গড়ে প্রায় ১০০ দিন সময় লাগত। বর্তমানে সেই সময় কমে ৫৪ দিনে নেমেছে।
ই-জিপি চালুর আগে মূল দরপত্রের মেয়াদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতো। বর্তমানে এ হার বেড়ে ৯৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে চুক্তি প্রদানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি এবং দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের হারও শতভাগে উন্নীত হয়েছে।
টেকসই ক্রয়ে জোর
সরকারি ক্রয়কে শুধু অর্থ সাশ্রয়, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কামরুজ্জামান।
তিনি বলেন, সরকারি ক্রয়ে টেকসই উন্নয়নের নীতি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ুসহনশীল ক্রয়ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্ভাবন, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বিপিপিএ। এর মাধ্যমে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।