| Your Ads Here 100x100 |
|---|
ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত পার্লামেন্ট নির্বাচনে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নির্বাচনে আরব দলগুলোর প্রার্থীরা ১৯টি আসনে জয়ী হয়েছেন। তাঁদের এই সাফল্যকে ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনীতিক ও ইসরায়েলের বিদেশি সমর্থকেরা। তবে দেশটির সরকার গঠন নিয়ে আলোচনায় এই আরব দলগুলোকে রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করতে অনীহা দেখাচ্ছেন ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান নেতারা।
নির্বাচনের ৯০ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টির জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। বাকি ১৯টি আসনে জয়ী হয়েছেন আরব রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা।
এই ফলাফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টের অন্তত ৬১ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নির্বাচনে ভালো ফল করার পরও তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
আরবদের ভোটাধিকার নিয়ে বিদেশে প্রশংসা
নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সমর্থক কয়েকজন রাজনীতিক দেশটির আরব নাগরিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, আরব নাগরিকদের ভোট দেওয়া, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য জোশ গটহাইমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ভোট দিতে এসেছেন। তাঁরা ভোট দিতে পারেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন এবং পার্লামেন্টে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে নারীদেরও এ ধরনের অধিকার দেওয়া হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গটহাইমার আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ এবং নির্বাচনে আরব নাগরিকদের অংশগ্রহণ সেই ব্যবস্থারই প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের আরেক সদস্য টম সুওজিও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইহুদি, খ্রিস্টান ও আরব ইসরায়েলি নাগরিকেরা মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশ নিয়েছেন। যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তোলেন, তাঁদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জবাব।
সুওজি আরও বলেন, ইসরায়েলের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মানুষের অভিন্ন মূল্যবোধের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও নির্বাচনে আরব নাগরিকদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলে আরবরাও ভোট দেন। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে এটি একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
তবে তাঁর বক্তব্যে আরব নাগরিকদের ইসরায়েলি জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে দেখানোর ইঙ্গিত রয়েছে বলে সমালোচনা হয়। পরে রাষ্ট্রদূত স্বীকার করেন, তাঁর ব্যবহৃত শব্দ যথাযথ ছিল না।
আরব নাগরিকদের নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা থাকলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে সরকার গঠন ও রাজনৈতিক জোটের আলোচনায় আরব দলগুলোকে প্রায়ই মূল সমীকরণের বাইরে রাখা হয়।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা দেশটির নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন এবং পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার গঠনের অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করার প্রশ্নে ইহুদি দলগুলোর মধ্যে অনীহা রয়েছে।
এ কারণেই এবারের নির্বাচনের ফলাফলকে অনেক সংবাদমাধ্যমে অমীমাংসিত পরিস্থিতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ আরব দলগুলো ১৯টি আসন পাওয়ায় তাদের সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সরকার গঠন কঠিন হয়ে পড়েছে।
নির্বাচনে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি হলো জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম। জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১২টি আসন। অন্যদিকে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম পেয়েছে সাতটি আসন।
দুটি দলই নেতানিয়াহুর বিরোধী হলেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলে পার্থক্য রয়েছে। সরকার গঠনের প্রশ্নে এই পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুবিরোধী জোটেও অনিশ্চিত আরব দলগুলো
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আরব দলগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা মূলত নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
কিন্তু গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের পাশাপাশি নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যানের মতো নেতারাও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইলেও আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক অংশীদারত্বের প্রশ্নে তাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। বেনেটের দল এবং লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু পার্টিও অ-ইহুদি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছে।
তাঁদের যুক্তি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে জনগণের সমর্থন নেই। তবে সমালোচকেরা মনে করেন, এই অবস্থান ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে সীমিত করে রাখছে।
অথচ ৭ অক্টোবরের হামলায় ইহুদি নাগরিকদের পাশাপাশি আরব ইসরায়েলিরাও নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ জিম্মি হিসেবেও গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলেন। ফলে আরব নাগরিকদের সবাইকে নিরাপত্তার প্রশ্নে সন্দেহের চোখে দেখা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন অনেকে।
জয়েন্ট লিস্টের অবস্থান
ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত জয়েন্ট লিস্ট সরকার গঠনের জন্য যেকোনো মূল্যে জোটে যোগ দিতে আগ্রহী নয়। তবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে দলটির আগ্রহ রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আরব নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নির্বাচনী প্রচারণায়ও তাঁর বক্তব্যে আরব ভোটারদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
সমালোচকদের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি করছে।
জয়েন্ট লিস্টের নেতারা মনে করেন, আরব নাগরিকদের ভোটের মাধ্যমে পাওয়া প্রতিনিধিত্বকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে ইহুদি দলগুলোর বড় অংশ এখনো এ ধরনের অংশীদারত্বের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রা’আমের সমঝোতার চেষ্টা
জয়েন্ট লিস্টের তুলনায় মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে বেশি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে। দলটি নেতানিয়াহুবিরোধী জোটে যোগ দিয়ে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
ইহুদি ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আব্বাস বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি নিজের দলের প্রার্থী তালিকায় পুলিশের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইয়োয়াভ সেগালোভিৎজকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
আব্বাস দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অবস্থানও বজায় রেখেছেন। রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। কারণ, আইজেনকোটের পক্ষ থেকে রা’আমের সঙ্গে অংশীদারত্বের আলোচনায় এমন স্বীকৃতিকে অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে নির্বাচনের ঠিক আগে আইজেনকোট নতুন একটি শর্ত সামনে আনেন। তিনি চান, রা’আমকে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সংগঠনটিকে ধ্বংস করার লক্ষ্য মেনে নিতে হবে।
আব্বাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জিম্মিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে নিয়ে দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমাধানকে সমর্থন করেছেন। হামাস এই সমাধান প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে হামাসকে ধ্বংস করার আহ্বান জানাতে আব্বাস রাজি হননি। এর একটি কারণ হিসেবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি সামনে এসেছে।
আব্বাসের দল আইজেনকোটের নতুন শর্তটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। রা’আমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের আলোচনা চলাকালে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও বেনেট ও লিবারম্যানের আপত্তি দূর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
নেতানিয়াহুর দ্বৈত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা নতুন নয়। তবে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নেতানিয়াহু নিজেও অতীতে রা’আমের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন।
২০২১-২০২২ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন সরকারে রা’আম অংশ নিয়েছিল। সেই সরকারের সময়ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা অভিযান বন্ধ হয়নি। বরং ২০২২ সাল ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছরগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
অতীতের এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, আরব দলের সঙ্গে রাজনৈতিক অংশীদারত্ব থাকলেই ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি দুর্বল হয়ে পড়ে—এমন দাবি কতটা যৌক্তিক।
আরও একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নেতানিয়াহু আরব দলগুলোকে ইহুদিবাদবিরোধী বলে সমালোচনা করলেও তাঁর নিজের জোটে এমন কিছু অতি-ধর্মীয় ইহুদি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা রয়েছেন, যাঁদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে প্রচলিত ইহুদিবাদী ধারণার বিরোধ রয়েছে। তাঁর জোটে কট্টরপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে নেতানিয়াহু একদিকে আরব দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, অন্যদিকে নিজের জোটের বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতা বজায় রাখছেন।
এর আগে নেতানিয়াহু রা’আমের সঙ্গে জোট গঠনের চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। পরে দলটি বেনেটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেয়। ফলে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন অসম্ভব—এমন দাবি বাস্তবতার পুরো চিত্র তুলে ধরে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
আরব ভোটকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগ
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আরব নাগরিকদের ভোটাধিকার সরাসরি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা না করলেও তাঁদের ভোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচনের দিন তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে আরব শহরগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে অভিযোগ করেন, আরব নাগরিকেরা তাঁর পক্ষ থেকে নির্বাচন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০১৫ সালের নির্বাচনেও নেতানিয়াহু একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তখন আরব ভোটারদের নিয়ে তাঁর মন্তব্য বর্ণবাদী বলে সমালোচিত হয় এবং পরে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।
এবারও তাঁর প্রচারণায় আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনাকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
ইসরায়েলের এক কট্টর ইহুদিপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যকার আরব নাগরিকদের রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণকে ‘রাজনৈতিক ৭ অক্টোবর’ বলে আখ্যা দেন। এর মাধ্যমে তিনি আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যকে রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে তুলে ধরেন।
বুধবার ভোরে বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার পথে আরব দলগুলোর সমর্থনে গঠিত সম্ভাব্য সরকারকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হলে তিনি আরও কঠোর অবস্থান নেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিপন্ন করে ইহুদিবাদবিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠন গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে সমালোচকেরা মনে করেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত করার অধিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক অংশ। কোনো রাজনৈতিক দল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেই তাদের ভোটকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলো
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সামনে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইজেনকোট, বেনেট ও লিবারম্যান তাঁদের নির্বাচনী অবস্থান থেকে সরে এসে রা’আম কিংবা জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে জোট গঠন করবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়াইর গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তবে ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ নেতার অবস্থান এখনো এই ধরনের জোটের বিপক্ষে।
ফলে আরব দলগুলো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেয়েও সরকার গঠনের আলোচনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে এসেছে। বিদেশে ইসরায়েলের সমর্থকেরা আরব নাগরিকদের ভোটাধিকার ও নির্বাচনী অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকার গঠনের অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করতে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈপরীত্য ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলেই কি তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়, নাকি সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়ার সুযোগও সমানভাবে থাকা প্রয়োজন?
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সাফল্য সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। ভোটের হিসাবে তারা সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলেও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে এখনো বাধার মুখে। ফলে তাদের নির্বাচনী সাফল্য নিজ দেশের রাজনীতির চেয়ে বিদেশে ইসরায়েলের গণতন্ত্রের পক্ষে প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—এমন মূল্যায়নও উঠে এসেছে।

