কাঁচাপাটের তীব্র সংকটে দেশের পাটকল শিল্প গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ও বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সদস্যভুক্ত প্রায় ২৬০টি পাটকল বন্ধের উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এসব মিল বন্ধ করে দেওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে দুই সংগঠন।
এই সংকটের বিষয়ে বিজেএমএ ও বিজেএসএ যৌথভাবে গতকাল সোমবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে মিলগুলোতে ভয়াবহ কাঁচাপাট সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের দেওয়া অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সংগঠনগুলোর অভিযোগ, শর্তসাপেক্ষে কাঁচাপাট রপ্তানির সুযোগ থাকায় বাজারে হঠাৎ করে পাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে মিলগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচাপাট সংগ্রহ করতে পারছে না। পাশাপাশি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ পাট মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, যার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ছে।
সংকট নিরসনে গত ১৩ জানুয়ারি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিজেএমএ ও বিজেএসএ মজুতদারদের একটি তালিকা পাট অধিদপ্তরের কাছে জমা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২১ জানুয়ারি পাট অধিদপ্তরে বিজেএমএ, বিজেএসএ ও বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ভারতে রপ্তানির উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ কাঁচাপাট মজুত করে রেখেছেন, তা নগদ মূল্যে পাটকলগুলোর কাছে বিক্রি করা হবে। একই সঙ্গে মিলগুলোর প্রকৃত কাঁচাপাটের চাহিদা নিরূপণের বিষয়েও একমত হন অংশগ্রহণকারীরা।
তবে বিজেএমএ ও বিজেএসএর অভিযোগ, পাট অধিদপ্তর থেকে কিছু প্রতীকী ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাস্তবে মজুতদাররা সরকারি নির্দেশনা মানছেন না। তারা কাঁচাপাট বাজারে ছাড়ছেন না, যার ফলে একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় সংগঠন দুটি মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের আওতাধীন ব্যবসায়ীদের গুদামে থাকা কাঁচাপাট যৌক্তিক দামে মিলগুলোর কাছে সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজেএসএর চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক বলেন,
“এই মুহূর্তে প্রায় সব কাঁচাপাট মজুতদারদের দখলে। সরকারকে অবহিত করার পর কিছু ক্যাম্পেইনধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি এমনই থাকলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিল বন্ধ করা ছাড়া মালিকদের আর কোনো উপায় থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, শর্তসাপেক্ষে কাঁচাপাট রপ্তানির সুযোগ থাকলেও এর আগে বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা মৌখিকভাবে রপ্তানির অনুমোদন না দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও কাঁচাপাট রপ্তানির অনুমতি দিচ্ছে না। তারপরও মজুতদারদের দখলে পাট চলে যাওয়ায় মিলগুলো কাঁচামাল পাচ্ছে না। তাঁর আশঙ্কা, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরবর্তীতে স্থানীয় বাজারে আরও বেশি দামে কাঁচাপাট ছাড়া হবে।