বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী । একই সঙ্গে চীনকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ উল্লেখ করে দেশটির সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও শিল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। এ লক্ষ্যে শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলার ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক বহু দশকের। এই সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে এটি কূটনীতি থেকে উন্নয়ন, উন্নয়ন থেকে বাণিজ্য এবং এখন শিল্প অংশীদারত্বের নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।”
চীনের প্রতি বাংলাদেশের আস্থার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং আমাদের অন্যতম দীর্ঘদিনের ও বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।”
চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উন্নত উৎপাদন, উচ্চমূল্যের অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। চীন যখন আরও উচ্চ পর্যায়ে এগিয়ে যাবে, তখন উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ নতুন ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য খুঁজবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের ভ্যালু চেইন সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে তারা যেমন বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারবে, তেমনি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার থেকেও লাভবান হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, সেবার ডিজিটাইজেশন, নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মূলধন ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকবে এবং তাদের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, Anwara-এ চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং-এ দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এসব অঞ্চলে বন্দর সংযোগ, লজিস্টিকস সুবিধা, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তিকে আরও আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব করতে কাজ চলছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি আস্থা ও সুরক্ষা পান।
তিনি বলেন, শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ইতোমধ্যে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সেবা ডেস্ক চালু করেছে। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগের সুযোগ, প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়া যাবে।
চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় খোলার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের লক্ষ্য খুবই সহজ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পেতে বাংলাদেশে আসার অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা তাদের আরও কাছে থাকতে চাই এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে চাই।”
তিনি আরও জানান, সরকার নতুন লাইসেন্স অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে, যার ফলে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বস্ত্রশিল্পের মতো খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা রাখার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষ দিকে চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা করছে। তারা আমাদের জনগণ, আমাদের সক্ষমতা এবং সম্ভাবনার কথা জানে। বাংলাদেশ সফল হতে পারে এবং সেই সাফল্যের অংশীদার হতে চীনকে আমরা স্বাগত জানাই।”
বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।