| Your Ads Here 100x100 |
|---|
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে ১৭টি দেশে অন্তত ২৫ বার সফর, দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকায় একই বিভাগে দায়িত্ব পালন এবং সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে তার চাকরিজীবন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ঢাকায়, একই বিভাগে ১৭ বছর
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কাজী মো. ফিরোজ হাসানের চাকরির বয়স প্রায় ২৮ বছর। খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর তিনি খুলনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ স্টাফ অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি।
এর কিছুদিন পরই বদলি হয়ে আসেন সাভার গণপূর্তে। ২০০১ সালে পিপিসি বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী-৩ পদে ঢাকায় বদলি হন। এরপর ২০০৯ সালে মাত্র এক মাস নেত্রকোনায় দায়িত্ব পালন ছাড়া প্রায় পুরো কর্মজীবনই ঢাকায় কেটেছে বলে জানা গেছে।
এ নিয়ে সহকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ফিরোজ হাসানের বক্তব্য, তিনি ঢাকায় থাকলেও মূলত বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন এবং নিয়মিত ওয়ার্কিং দায়িত্বে ছিলেন না।
‘পেকু ফিরোজ’ নামটি যেভাবে
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকিউরমেন্ট, এস্টেট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ইউনিট বা পেকু বিভাগে যোগ দেন।
এরপর দীর্ঘ সময় এই বিভাগেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী এবং পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে সংস্থাপন শাখার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বের পাশাপাশি পেকু বিভাগের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে মূলত ক্রয় ও প্রকিউরমেন্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ পরিচালিত হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর একই বিভাগের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সহকর্মীদের মধ্যে তিনি ‘পেকু ফিরোজ’ নামেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
১৭ দেশে অন্তত ২৫ বার সরকারি সফর
ফিরোজ হাসানকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি বিষয় তার বিদেশ সফর।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জুনে মালয়েশিয়ায় ‘ফ্যাসিলিটি মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তার বিদেশ সফর শুরু হয়।
এরপর সরকারি অর্থায়নে তিনি জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন বলে জানা গেছে।
অর্থাৎ মোট ১৭টি দেশে অন্তত ২৫ বার সফরের তথ্য সামনে এসেছে।
এ বছর সেন্ট্রাল এসি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একটি প্রশিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা থাকলেও বিমানবন্দরে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত সফরটি আর হয়নি বলে জানা গেছে।
তবে বিদেশ সফরের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফিরোজ হাসান বলেছেন, তিনি এতগুলো প্রশিক্ষণে যাননি এবং গণপূর্তে তার চেয়েও বেশি প্রশিক্ষণে যাওয়া কর্মকর্তা রয়েছেন।
দক্ষতা ও দায়িত্ব নিয়েও সহকর্মীদের প্রশ্ন
ফিরোজ হাসানের দীর্ঘদিন একই বিভাগে থাকার পাশাপাশি তার কর্মদক্ষতা নিয়েও কিছু সহকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের অভিযোগ, ওয়ার্কিং বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব না নেওয়ার কারণে প্রকৌশলগত মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি নিজের সীমাবদ্ধতা আড়াল করতে তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ করতেন বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফিরোজ হাসান নতুন একটি রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তিনি অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন।
এমনকি গণপূর্তের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন তথ্য ও ‘আমলনামা’ সচিবের কাছে সরবরাহ করার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরবর্তীতে এসব তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
লটারি পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক
বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানোর যুক্তিতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হলেও এর প্রভাব নিয়ে গণপূর্তের ভেতরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এক পক্ষের মতে, লটারির মাধ্যমে বদলি হলে তদবির ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমবে।
অন্যদিকে, আরেক পক্ষের অভিযোগ—একযোগে বড়সংখ্যক প্রকৌশলীকে বদলি করলে চলমান প্রকল্প ও মাঠপর্যায়ের কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষ করে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একসঙ্গে সরিয়ে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলে নতুনদের প্রকল্প বুঝে নিতে সময় লাগবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এখন প্রশ্ন, কী বলছেন ফিরোজ হাসান?
দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকা, একই বিভাগে দায়িত্ব পালন, একাধিক বিদেশ সফর এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে কাজী মো. ফিরোজ হাসানকে ঘিরে আলোচনা এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে।
তবে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন সরকারি নথি যাচাই, সফরের ব্যয় ও অনুমোদন পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্ত।

