28.4 C
Dhaka
রবিবার, নভেম্বর ৮, ২০২৬

এআই খাতে নিয়ন্ত্রণের শঙ্কা, বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধস

জনপ্রিয়
- Advertisement -
Your Ads Here
100x100

 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার থেকে শুরু করে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে এই পতনের প্রভাব। এক দিনের লেনদেনে বিশ্বের শীর্ষ সাত প্রযুক্তি কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলার।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ, ডেটা সেন্টার নির্মাণে রাজনৈতিক বাধা এবং সম্ভাব্য সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা দিয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এতে সূচকটির বাজারমূল্য থেকে আনুমানিক ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে। সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে অন্তত ১০ শতাংশ পতনের কারণে নাসডাক এখন ‘কারেকশন’ পর্যায়ে রয়েছে। তবে বড় ধরনের দরপতনের পরও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সূচকটি এখনো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পতনের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ায়। শুক্রবার এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ব্যাপক দরপতন দেখা যায়। জাপানের নিক্কেই সূচক কমেছে ৬ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক একপর্যায়ে ৮ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। আতঙ্কে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি ঠেকাতে সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ করে দেয় দেশটির কর্তৃপক্ষ। দিন শেষে সূচকটি ৬ শতাংশ কমে বন্ধ হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দামও ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। এআই প্রযুক্তির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইউরোপের শেয়ারবাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। জার্মানির ড্যাক্স সূচকের পতন হয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এআই খাতে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনের আশঙ্কায় ইউরোপের বাজারেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় শেয়ারবাজারে এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ। নির্বাচনী প্রচারে দলটির বিভিন্ন প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে এসব অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব, বিদ্যুতের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের ওপর চাপের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

ডেটা সেন্টার হলো এমন এক ধরনের অবকাঠামো, যেখানে বিপুলসংখ্যক সার্ভার ও কম্পিউটার রাখা হয়। এআই প্রযুক্তি পরিচালনা, তথ্য সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালু রাখতে এসব কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ এবং পানি প্রয়োজন হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে এআই ও ডেটা সেন্টার খাতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন নীতিমালা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ও মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরও সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় কবে আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামো, উন্নত চিপ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু এসব বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা আয় হবে এবং কত দিনে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এ জে বেলের বাজার বিশ্লেষক ড্যান কোটসওয়ার্থ বলেন, এআই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু কবে বা আদৌ সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসবে, তা স্পষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এআই খাতের পাশাপাশি ইলন মাস্কের দুই প্রতিষ্ঠান টেসলা ও স্পেসএক্সের বাজারমূল্যেও বড় পতন হয়েছে। বৃহস্পতিবার টেসলার শেয়ারের দাম প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। একই দিনে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম কমেছে ৮ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য কমেছে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি।

এদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ারের দামও ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে এনভিডিয়ার চিপের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কোম্পানিটির শেয়ারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ দেখা দিয়েছে।

ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে জনমতের পরিবর্তন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান বলেছেন, ডেটা সেন্টার নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় প্রযুক্তি খাতের অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। স্থানীয় জনগণের সমর্থন ছাড়া নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা কঠিন।

তিনি মনে করেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা এবং তাঁদের আস্থা অর্জন করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, শেয়ারবাজারের এই পতনের জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে শুক্রবার তিনি এআই খাতের প্রতি নিজের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এআই খাতের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারের এই অস্থিরতা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল নয়। এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য আয়, ডেটা সেন্টার নির্মাণে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাধা এবং সরকারের সম্ভাব্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।

তাঁদের মতে, আগামী দিনে এআই খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি খাতের নীতিমালা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তার ওপরই বিশ্ব শেয়ারবাজারের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

- Advertisement -spot_img
সর্বশেষ

ওমান উপসাগরে আগুন লাগা একটি কার্গো জাহাজ থেকে ২২ জন ক্রুকে উদ্ধার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ন্যাশনাল গার্ড।...